সাংবাদিকতায় আগ্রহীরা যোগাযোগ করুন: ০১৭১১৫৭৬৬০৩
  • সকাল ১১:৪৬ | ২৯শে মার্চ, ২০২০ ইং , ১৫ই চৈত্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ৫ই শাবান, ১৪৪১ হিজরী

ব্রাহ্মণবাড়িয়া মুক্ত দিবস ও কিছু কথা

।। এইচ.এম. সিরাজ ।।

‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি।’
আমি বিজয় দেখিনি
বিজয়ের গল্প শুনেছি।
আমি বশ্যতা মানিনি
বিজয় ছিনিয়ে এনেছি।
আমি আপোষ করিনি
গৌরবে বাঁচতে শিখেছি।
আমি বহু রক্ত খুইয়েছি
বিজয়ের মাস পেয়েছি।
গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধিকারের মুক্তিযুদ্ধ, বিজয়ের মুক্তিযুদ্ধ। বাঙালি চিরকালেরই বীর জাতি, তার প্রমাণ একাত্তর, মহান মুক্তিযুদ্ধ; যারই ফসল বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য একটি নাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া। এ জনপদ থেকে রেল-সড়ক এবং নৌপথে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগ ছিলো সহজতর। সীমান্তের ওপারেই ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বিভিন্ন ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ গ্রহণান্তে মুক্তিবাহিনীর গেরিলারা এই জনপদ দিয়ে দেশাভ্যন্তরে প্রবেশ করেই যেতো অন্যত্র। অর্থাৎ ভারতে প্রশিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবেশদ্বারই ছিলো ব্রাহ্মণবাড়িয়া। তৎপ্রেক্ষিতেই এটির প্রতি ছিলো পাকিস্তানিদের শ্যানদৃষ্টি, চালাতো সাড়াশী অভিযান। তৎকালীন সময়ে এখানকার অন্তত ১০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়ায় মুক্তিযুদ্ধে। সঙ্গতেই মুক্তিযুদ্ধ পরিণত হয় জনযুদ্ধে। আর তা চলে একেবারে চূড়ান্ত বিজয়ের আগ মুহূর্ত অবধি। এজাতীয় নানাবিধ কারণেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহান মুক্তিযুদ্ধের সূতিকাগার নামে খ্যাত,আর এ সূতিকার হানাদার মুক্ত হয় বিজয়ের মাত্র ৮ দিন আগের ৮ ডিসেম্বর, অর্থাৎ আজকের এই দিনটাতেই। সঙ্গতেই দিনটি ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসীর কাছে অতীব স্মরণীয় আর গুরুত্ববহ।

২৫ মার্চের কালোরাতে পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতম হামলার পর থেকে ৮ ডিসেম্বর হানাদার মুক্ত হবার পূর্ব পর্যন্ত এই পুরো জনপদটিই ছিলো রণাঙ্গন। ৬ ডিসেম্বর সীমান্তবর্তী আখাউড়া শত্রুমুক্ত হবার পর মুক্তিবাহিনীর একটি দল দক্ষিণ দিক থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের দিকে অগ্রসর হয়। ৭ ডিসেম্বরের মধ্যে পাকবাহিনী এবং তাদের দোসরেরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর ছেড়ে পালায়।ফলে মুক্ত হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর। মুক্তি পাগল জনতা স্বজন হারানোর সকল ব্যথা ভুলে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে আকাশ-বাতাস করে তুলে মুখরিত। শহরে প্রবেশ করে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনী।৮ ডিসেম্বর সকালে মহান মুক্তিযুদ্ধের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলীয় কাউন্সিলর প্রধান জহুর আহমেদ চৌধুরী ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের পুরাতন কাচারি ভবন সংলগ্ন মহকুমা প্রশাসকের কার্যালয় প্রাঙ্গনে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলন করেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকা।

স্বাধীনতা যুদ্ধের পুরো নয় মাস জুড়েই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানীদের সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের হয় সম্মুখযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্যই সমগ্র বাংলাকে ভাগ করা হয় ১১টি সেক্টরে। আবার প্রত্যেকটা সেক্টরকে বিভক্ত হয় কতেকটি সাব-সেক্টরে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দক্ষিণাংশ,দক্ষিণ-পূর্ব কসবা,আখাউড়া এবং গঙ্গাসাগর থেকে পশ্চিমে ভৈরববাজার রেললাইন পর্যন্ত ২নং সেক্টর। বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার সিঙ্গারবিল থেকে উত্তরে হবিগঞ্জ পর্যন্ত ছিলো ৩নং সেক্টরের অন্তর্ভূক্ত।

২নং সেক্টরের কমাণ্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ(পরে বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল)তাঁর সেক্টরকে বিভক্ত করেন ছয়টি সাব-সেক্টরে। বিভক্ত ছয়টির মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা, আখাউড়া, গঙ্গাসাগর এলাকার সাব-সেক্টরের কমাণ্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ আইন উদ্দিন (পরবর্তীতে বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল পিএসসি)। এই সাব-সেক্টরটি কসবা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দক্ষিণাংশ, আখাউড়া, সৈয়দাবাদ, নবীনগর, বাঞ্ছারামপুর এবং কুমিল্লার মুরাদনগর পর্যন্ত অপারেশন চালাতো। নিয়মিত-অনিয়মিত ও প্রশিক্ষিত গেরিলা সৈনিকদের নিয়ে অক্টোবর মাসে গঠন করা হয় নবম বেঙ্গল রেজিমেন্ট।

মন্দভাগ সাব-সেক্টরের কমাণ্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন এইচ. এম.এ গাফফার (পরবর্তীতে বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত লে. কর্ণেল)। এরই তদাধীন চতুর্থ বেঙ্গলের ‘সি’ মানে ‘চার্লি’ কোম্পানি ও মর্টারের একটি দল অপারেশন মন্দভাগ রেলস্টেশন থেকে কুটি পর্যন্ত অপারেশন চালাতো। এছাড়া সালদানদী কোনাবন সাব-সেক্টর কমাণ্ডারও তিনিই ছিলেন। তাঁর কমাণ্ডে প্রায় চৌদ্দশ’র মধ্যে প্রায় আটশ’ ব্যাটালিয়ন সৈন্য এবং প্রায় ছয়শ’ সাব সেক্টর ট্রুপসে।বেঙ্গল রেজিমেন্ট,ইপিআর,পুলিশ ও যুদ্ধকালীন প্রশিক্ষণে গড়া সৈনিকরা ব্যাটালিয়নের অন্তর্ভূক্ত। আর ছাত্র-যুবক-কৃষকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের মুক্তিযোদ্ধারাই ছিলো সেক্টর ট্রুপসে।

ক্যাপ্টেন গাফফারের ব্যাটালিয়নে কোম্পানি ছিলো চারটি। তন্মধ্যে(এ) আলফা’র কমাণ্ডার ছিলেন সুবেদার গোলাম আম্বিয়া।’ব্রাভো’র(বি)কমাণ্ডার ছিলেন সুবেদার ফরিদ, (সি) ‘চার্লি’র কমাণ্ডার সুবেদার আব্দুল ওহাব (বীরবিক্রম) ও (ডি) ‘ডেল্টা’র কমাণ্ডার ছিলেন সুবেদার তাহের। আর ব্যাটালিয়নের সেকেণ্ড ইন কমাণ্ড ছিলেন লেফটেন্যান্ট কবির (পরে ক্যাপ্টেন)। এর দু’টো মর্টার প্লাটুনের একটির কমাণ্ডার সুবেদার জব্বার ও অন্যটির সুবেদার মঈন (বীরউত্তম)। যুদ্ধের বাস্তবতায় প্রায়শই এক সেক্টরের সদস্য অপর সেক্টরেও যুদ্ধ করে। ২নং সেক্টরাধীনে প্রায় ৩৫ হাজার গেরিলা এবং ছয় হাজার নিয়মিত বাহিনীর সদস্য যুদ্ধ করে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন এলাকায় গেরিলা অপারেশনের মধ্য দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা হানাদারদেরকে সর্বদা রাখতো সন্ত্রস্ত। সালদানদী, বায়েক, মন্দভাগ, নয়নপুর, কসবা, গঙ্গাসাগর, আখাউড়াসহ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকাতে পাকিস্তানীদের সাথে মুক্তিবাহিনীর প্রায়শই হতো সম্মুখ যুদ্ধ। মার্চ থেকে ডিসেম্বরের চূড়ান্ত বিজয়ের আগ মুহূর্ত অবধি যুদ্ধ হয়েছে এই জনপদে। এতদ সঙ্গত কারণেই ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে মুক্তিযুদ্ধের তীর্থভূমি বলা হয়ে থাকে। যুদ্ধকালীন নয়টি মাসজুড়েই মূলত সীমান্ত অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি হানাদারের সঙ্গে স্বাধীনতাকামী মুক্তিবাহিনী তথা সাধারণ মানুষের তুমুল যুদ্ধ হয়।

৩০ নভেম্বর থেকেই ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে শত্রুমুক্ত করতে পূর্বাঞ্চলের প্রবেশদ্বার নামে খ্যাত আখাউড়া সীমান্ত এলাকায় মিত্রবাহিনী পাকিস্তানিদের ওপর বেপরোয়া আক্রমণ চালাতে থাকে। পরদিন ১ ডিসেম্বর আখাউড়া সীমান্ত এলাকায় সংঘটিত প্রচণ্ডতম যুদ্ধে ২০ হানাদার নিহত হয়। ৩ ডিসেম্বর আখাউড়ার আজমপুরের যুদ্ধে নিহত হয় পাকিস্তানি ১১ হানাদার, শহীদ হন তিনজন মুক্তিযোদ্ধা। পরদিন ৪ ডিসেম্বর হানাদাররা পিছু হটতে থাকলে আখাউড়া অনেকটাই শত্রুমুক্ত হয়। আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশনের তুমুল যুদ্ধে দু’শতাধিক পাকিস্তানি সেনা হতাহত হয়। এর দু’দিন পর অর্থাৎ ৬ ডিসেম্বর আখাউড়া সম্পূর্ণভাবে হানাদার মুক্ত হয়।

আখাউড়া মুক্ত হবার পরই চলতে থাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া হানাদারমুুক্ত করার প্রস্তুতি। মুক্তি বাহিনীর একটি অংশ শহরের দক্ষিণ দিক থেকে কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়ক দিয়ে এবং মিত্র বাহিনীর ৫৭তম মাউন্টের ডিভিশন আখাউড়া-ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেললাইন এবং উজানীসার সড়ক দিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। সেসময় শহরের চতুর্দিকেই মুক্তিবাহিনী শক্ত অবস্থানে থাকায় খান সেনারা পালানোকালে সময় ৬ ডিসেম্বর রাজাকারদের সহায়তায় নির্মম-পৈশাচিকতম হত্যাকাণ্ড চালায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজের অধ্যাপক কে.এম. লুৎফুর রহমানসহ ব্রাহ্মণবাড়িয়া কারাগারে আটকে রাখা অর্ধশত বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ মানুষকে দু’চোখ বেঁধে শহরের দক্ষিণ প্রান্তের কুরুলিয়া খালের পাড়ে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। পরদিন ৭ ডিসেম্বর রাতের আঁধারে পাকিস্তানি হানাদাররা ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর ছেড়ে আশুগঞ্জের দিকে পালাতে থাকে। ফলে ৮ ডিসেম্বর অনেকটা বিনা বাধায় বীর মুক্তিবাহিনী এবং মিত্রবাহিনীর সদস্যরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে প্রবেশ করে স্বাধীনতার বিজয় পতাকা উড্ডীন করেন। মুক্ত হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া। সেই থেকে ৮ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া মুক্ত দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। এদিকে একই দিন সন্ধ্যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পার্শ্ববর্তী সরাইল এলাকাও  হানাদার মুক্ত হয়।

আজকের এই দিনে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে সকল শহীদ ও বীরমুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি রইলো বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক: এইচ.এম.সিরাজ, সাংবাদিকশিক্ষানবিশ অ্যাডভোকেট
নির্বাহী সম্পাদকদৈনিক প্রজাবন্ধু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

 

Play
Play
previous arrow
next arrow
Slider

ফেসবুকে আমাদের সাথে থাকুন

তথ্য-প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে একটি বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। এই ধারার কারণে বহু সাংবাদিককে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে অনেক মামলা হয়েছে। অনেককে কারাগারেও যেতে...

    ১৭ই মার্চ, ১৯২০ সালে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় শেখ লুৎফুর রহমান এবং সায়রা বেগমের ঘরে জন্ম নেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। গোপালগঞ্জ...

previous arrow
next arrow
ArrowArrow
Slider

  …..ইঞ্জিনিয়ার চৌধুরী নেসারুল হক প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বরাট জনকল্যাণ ফাউন্ডেশন   জীবনের ক্ষুধা, তৃষ্ণা ছাড়াও, মানুষ এক কাল্পনিক জগতের চাহিদায় যেন সদা ব্যাকুল। কল্পনা যখন বাস্তবে শিল্পসম্মতভাবে প্রকাশ পায় তখন...

Archives

Apr0 Posts
May0 Posts
Jun0 Posts
Jul0 Posts
Aug0 Posts
Sep0 Posts
Oct0 Posts
Nov0 Posts
Dec0 Posts
Jan0 Posts
Feb0 Posts
Mar0 Posts
Apr0 Posts
May0 Posts
Jun0 Posts
Jul0 Posts
Aug0 Posts
Nov0 Posts
L0go

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি